তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি খতিয়ে দেখবে হাইকোর্টের কমিটি

নিউজ ডেস্ক ঃ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক ধস খতিয়ে দেখতে কারণ উদঘাটন (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং) কমিটি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০০২ সাল থেকে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ও নিরূপণ করবে এই কমিটি। মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের একক বেঞ্চ এ কমিটি করেন। তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো- বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। এদিকে বেসিক ব্যাংকের আত্মসাৎকৃত ৩১০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আগে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বে বসে ‘মধু খেয়েছেন’ বলেও মন্তব্য করেন হাইকোর্ট। পিপলস লিজিংয়ে অবসায়ন সংক্রান্ত মামলার শুনানিকালে একই বেঞ্চ বিভিন্ন মন্তব্য করেন।

দুদক প্রসঙ্গে আদালত বলেন, পিকে হালদারের বিষয়ে আমরা আদেশ দিলাম সেই কবে। আর জানুয়ারিতে এসে দুদক বলল, পিকে হালদার পালিয়ে গেছে। আদালত বলেন, পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা মোটা অংকের টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বা দুদক কিছুই করতে পারল না। এক পর্যায়ে আদালত ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে ডাকাত বলে সম্বোধন করেন। আদালত বলেন, সাধারণ মানুষের টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে, তারা ডাকাত। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড যাতে চালু থাকে সেজন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যানের বক্তব্য শুনবেন হাইকোর্ট। আগামী বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তাদের বক্তব্য শুনবেন উচ্চ আদালত।

এদিকে বেসিক ব্যাংকের আত্মসাৎকৃত ৩১০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি ১০০০ কোটি টাকার গতিপথ নির্ণয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। প্রতিবেদনটি আগামী মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জমা হবে তিনি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সুপারিশ করা হলে তার সঙ্গে সাবেক সচিব ও একজন বিচারককে যুক্ত করে ৭ সদস্যের কমিটি চূড়ান্ত করে দেন আদালত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানকে সভাপতি ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সারোয়ার হোসেনকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক একেএম ফজলুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. কবির আহাম্মদ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-৪ এর মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আমীন। আর আদালত যে দুজনকে কমিটিতে যুক্ত করেছে, তারা হলেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মহিদুল ইসলাম ও সাবেক সচিব নুরুর রহমান।
আদালত আদেশে বলেছেন, এই তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের সঙ্গে কমিটির কোনো সদস্য জড়িত থাকলে বা কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সেই সদস্য দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। এই কমিটি তদন্তের প্রয়োজনে এই তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে।
বিআইএফসির পরিচালনা পর্ষদ অপসারণের নির্দেশনা চেয়ে বিদেশি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান ‘টিজ মার্ট ইনকরপোরেটেড’-এর করা এক আবেদনে গত বছর ১৭ ডিসেম্বর পর্যবেক্ষণসহ আদেশ দেন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ। সেই আদেশের পর্যবেক্ষণে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজে উষ্মা প্রকাশ করা হয়। ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথাও বলা হয় আদালতের পর্যবেক্ষণে।
হাইকোর্ট মনে করেন, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো উচিত। এই পর্যবেক্ষণের পরই গত ১৫ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে গত সোমবার তা আদালতে দাখিল করে। তবে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি) বিদেশি অংশীদার ‘টিজ মার্ট ইনকরপোরেটেডর আইনজীবী ওমর ফারুখ এ কমিটির বিষয়ে আপত্তি তোলেন আদালতে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যাদের নিয়ে এই কমিটি করেছে, তারা কোনো না কোনো সময় এজিএম ছিল, ডিজিএম ছিল। সুতরাং তারা এই প্রক্রিয়ার (আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতি) সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। অনেক কিছুতে তারা স্বাক্ষরকারী হয়েও থাকতে পারেন।

তাদের দিয়ে এ বিষয়টির তদন্ত হলে ভালো ফল পাওয়ার আশা করা যায় না। তাছাড়া কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তখন আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত কমিটির সঙ্গে দুজন স্বাধীন-নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে যুক্ত করে কমিটি চূড়ান্ত করে দেন। আদালতে বাংলাদেশের ব্যাংকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।
পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ : পিপলস লিজিংয়ের সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিক্যুডেটর) মো. আসাদুজ্জামান খানের করা এক আবেদনে পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৫শ জনের বেশি ঋণগ্রহীতার একটি তালিকা দাখিল করা হয়। এই তালিকা দাখিলের পর ৫ লাখ টাকা এবং তার ওপরে নেওয়া ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যারা খেলাপি হয়েছে এমন ২৮০ জনকে তাদের ২১ জানুয়ারি এক আদেশে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। এদের মধ্যে ১৪৩ জনকে মঙ্গলবার হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এদের মধ্যে মঙ্গলবার ৪৯ জন হাজির হন। আর অন্যরা আইনজীবীর মাধ্যমে সময় চেয়ে আবেদন করেন। ১৪৩ জনের মধ্যে বাকি যারা হাজির হননি তাদের দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে। ২৮০ জনের মধ্যে বাকি ১৩৭ জনের হাজির হওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য রয়েছে। আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম, ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে অ্যাডভোকেট গাজী মোস্তাক আহমেদ, পিপলস লিজিংয়ের সাময়িক অবসায়ক আসাদুজ্জামানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মেজবাহুর রহমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here