বাংলার ক্ষণজন্মা কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

রেজওয়ানুল ইসলামঃ

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।

রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অতি আধুনিক কালের সবথেকে ক্ষণজন্মা কবি, গীতিকার । বিদ্রোহ কিনবা প্রেম সবখানেই তারুণ্য ও সংগ্রামের দিপ্ত প্রতীক তিনি। সমগ্র বাংলায় এখনও তিনি “প্রতিবাদী রোমান্টিক কবি” হিসাবে খ্যাত। আশির দশকে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠে যে কজন কবি বাংলাদেশি শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তাদের অন্যতম ছিলেন রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তার জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম “যে মাঠ থেকে এসেছিল স্বাধীনতার ডাক, সে মাঠে আজ বসে নেশার হাট”, “বাতাসে লাশের গন্ধ”। কবির স্মরণে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মংলার মিঠেখালিতে গড়ে উঠেছে “রুদ্র স্মৃতি সংসদ”।

অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে। তার কবিতায় তিনি তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশাত্মবোধ, গণআন্দোলন, ধর্মনিরপেক্ষতা, ও অসাম্প্রদায়িকতা। তিনি তার কাব্যের এক প্রান্তে যেমন সংগ্রাম ঠিক তেমন অপর প্রান্তে রয়েছে স্বপ্ন, প্রেম ও সুন্দরের আকাঙ্ক্ষা।

 

 

 

প্রতিবাদী এই রোমান্টিক কবির জন্ম রুদ্রর জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশাল রেডক্রস হাসপাতালে। তিনি তার পিতার কর্মস্থল বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার মূল বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার মিঠেখালি গ্রামে। রুদ্রর পিতৃদত্ত নাম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ছোটবেলায় এই নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। লেখালেখির জগতে এসে নামটি তিনি নিজেই বদলে দেন। নামের আগে যোগ করেন ‘রুদ্র’, ‘মোহাম্মদ’-কে করেন ‘মুহম্মদ’ আর ‘শহীদুল্লাহ’-কে ‘শহিদুল্লাহ’।রুদ্রর লেখাপড়ায় হাতেখড়ি আর লেখালিখিতে আগ্রহ দুটোই তৈরি হয় এই নানাবাড়িতে। সে সময় ঢাকার বিখ্যাত ‘বেগম’ আর কলকাতার ‘শিশুভারতী’ পত্রিকা আসতো তার নানাবাড়িতে। সাথে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের বইপত্র তো ছিলই। রুদ্র মজে যান এসবের মধ্যে। তার পিতামাতার ইচ্ছা ছিল, তিনি হবেন একদিন বড় ডাক্তার কিন্তু প্রতিবাদী এই রোমান্টিক কবি বিজ্ঞানের পথে আর না গিয়ে চলে এলেন তার পছন্দের মানবিক শাখায় ।

ঢাকা কলেজে এসে রুদ্র পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন । এ সময় তিনি সহপাঠী হিসেবে সাথে পাণ কামাল চৌধুরী, আলী রিয়াজ, জাফর ওয়াজেদ, ইসহাক খানসহ একঝাঁক তরুণ সাহিত্যকর্মী। ১৯৭৫ সালে রুদ্র উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ২য় বিভাগে। এঈ দুই বছরে তিনি ক্লাস করেছিলেন মাত্র ১৮টি। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে।

মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীন বাংলাদেশ কবির স্বপ্নের পটভূমিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তিনি হাতে তুলে নিলেন স্বপ্নবান অস্ত্র, ‘কবিতা’, নিজেকে চেনালে ‘শব্দ-শ্রমিক’ হিসেবে।সমাজে বিদ্যমান অসাম্য, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তার শিল্পিত উচ্চারণ দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ পাঠকের হূদয়ে স্থান করে নিলেন।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক। তারুণ্য ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রতীক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ৩৪ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্যনাট্য এবং “ভালো আছি ভালো থেকো”সহ অর্ধশতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন। তার লেখা কাব্যগ্রন্থ গুলো হলো উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯),ফিরে পাই স্বর্ণগ্রাম ১৯৮২,মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪),ছোবল (১৯৮৬),গল্প (১৯৮৭),দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮),মৌলিক মুখোশ (১৯৯০)। জনপ্রিয় গান ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ তারুণ্য ও সংগ্রামের দীপ্তপ্রতীক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র লেখা ও সুরারোপিত। পরবর্তীকালে এ গানটির জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরণোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন।এ ছাড়া ১৯৮০ সালে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কারসহ জীবদ্দশায় বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি বহুল আলোচিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বিয়ে করেন। ৭ বছর স্থায়ী ছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। ১৯৮৮ সালে তাদের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। ছাড়াছাড়ির পরে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে কবিতা যুদ্ধ শুরু করেন। তসলিমা রুদ্রকে উদ্দশ্যে করে লেখা কবিতায় যখন রুদ্রকে নপংষুক বলে গালি দেন, তাকে বেড়ালের সাথে তুলনা করেন তখন রুদ্রও তার কবিতায় তসলিমাকে বেড়াল পোষার পরামর্শ দেন।রুদ্রর সাথে বিচ্ছেদের পরে তসলিমা আরও দুইবার বিয়ে করেন। কিন্তু অভিমানী রুদ্র কয়েক বছর পরেই চলে যান না ফেরার দেশে।মৃত্যুর কয়েক বছর পর তসলিমা নাসরীন রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেন। রুদ্র মারা যাওয়ার পরে তসলিমা অবশ্য হরহামেশাই রুদ্রর কথা, রুদ্রর প্রতি তার প্রেমের কথা স্বীকার করেছেন।

জীবনের শেষ সময়ে রুদ্র শরীরের উপর যথেষ্ট অত্যাচার করতেন। এসময় তিনি হয়ে যান তুখোড় মদ্যপ, খাবারে অনিয়ম সব মিলিয়ে বাঁধিয়েছিলেন পাকস্থলীর আলসার। পায়ের আঙুলে হয়েছিল বার্জার্স ডিজিজ।কবি এসময় তার এই শরীরের অসুস্থতা নিয়েও তিনি ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তে যেতেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি নিয়মিত আসতেন নীলক্ষেত-বাবুপুরায় কবি অসীম সাহার ‘ইত্যাদি’-তে। এই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেছেন-

“কেউ তাকে সামান্য আশ্রয় দেয়নি। কেবল অসীম সাহা দিয়েছিল, নীলক্ষেতে তার টেবিলের বাঁ-পাশে রুদ্রকে একটা চেয়ার দিয়েছিল বসবার জন্য। রুদ্র সকাল, দুপুর, বিকেল ঐ একটি চেয়ারে নিমগ্ন বসে জীবন পার করতো।”

১৯৯১ সালের ১০ জুন পাকস্থলিতে আলসারজনিত অসুস্থতায় হয়ে ভর্তি হনঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। খানিকটা সুস্থ হয়ে ২০ জুন বাসায় ফেরেন।২১ জুন শুক্রবার (০৭ আষাঢ় ১৩৯৮) সকাল সাড়ে সাতটায় দাঁত ব্রাশ করার সময়ে Sudden cardiac Arrest – এ আক্রান্ত হন। এর মাত্র ১০/১৫ মিনিট পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, ঢাকার ৫৮/এফ পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা ভাষায় অসামান্য কবি রুদ্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here